https://tipswali.com/wp-content/uploads/2021/06/aloevera.jpg

এলোভেরা বা ঘৃতকুমারী আমাদের কাছে খুবই পরিচিত একটি নাম। এটি মূলত একটি আয়ুর্বেদিক ঔষুধ। রোগ নিরাময় থেকে শুরু করে রূপচর্চায়ও এর বহুবিধ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

সম্মানিত ভিজিটর আজকের লেখাজুড়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো, ঘৃতকুমারী বা এলোভেরার উপকারিতা, এলোভেরা খাওয়ার নিয়ম, রূপচর্চায় ঘৃতকুমারীর নানা ব্যবহার ও কিভাবে এর ব্যবহার করবেন, চাষ পদ্ধতি। এছাড়াও আরও ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করবো ঘৃতকুমারী বা এলোভেরার দাম, কোথায় কিনতে পাওয়া যায়, সহ অন্যান্য বিষয় বিস্তারিত।

এলোভেরা কি?

Aloe Vera (অ্যালোভেরা) বাংলা অর্থ ঘৃতকুমারী। যা সবার নিকট এলোভেরা নামেই বেশি পরিচিত। এটি একটি রসালো উদ্ভিদ প্রজাতি। মূলত ঘৃতকুমারী এলো পরিবারের একটি উদ্ভিদ। এই গাছ দেখতে বেশ কিছুটা ফণীমনসা গাছের ন্যায়। ধারনা করা হয় প্রায় ৬ হাজার বছর আগে মিশরে এই এর উৎপত্তি ঘটে।

এলোভেরার গুনাগুন

ঘৃতকুমারী বা এলোভেরার গুনাগুন শুনে আপনি অবাক হয়ে যেতে পারেন। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট এর তথ্য মতে এতে প্রায় ৭৫ টি সক্রিয় উপাদান রয়েছে। এদের মধ্যে ভিটামিন, এনাইজম, খনিজ, সুগার, স্যাপোনিনস, অ্যামিনো অ্যাসিড, স্যালিসিলিক অ্যাসিড, এছাড়াও এতে ভিটামিন বি ১২, ফলিক অ্যাসিড এবং কোলিন রয়েছে।

এলোভেরার উপকারিতা, ব্যবহার ও খাওয়ার নিয়ম

এলোভেরা দিয়ে রূপচর্চা বা ফেসিয়াল এর কাজে এলোভেরার বেশ সুনাম রয়েছে। চলুন এপর্যায়ে মেডিকেল নিউজ টুডে, হেলথ লাইন, ও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতে এলোভেরার নানা উপকারিতা, এলোভেরা খাওয়া ও ব্যবহারের নিয়ম জেনে নেওয়া যাক।

১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

মানসিক চাপ কিংবা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অ্যালোভেরা কিংবা ঘৃতকুমারীর বেশ কার্যকরী। এতে থাকা ভিটামিন ও খনিজ উপাদান আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম। কেবল মাত্র অল্প সংখ্যক উদ্ভিদের মধ্যে ভিটামিন-১২ রয়েছে যাদের মধ্যে ঘৃতকুমারী একটি।

২. হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি

আমাদের মধ্যে অনেকেরই প্রায়সই হজম জনিত সমস্যা দেখা দেয়। আর এই সমস্যা থেকে শরীরে আরও নানা রোগের বাসা বাধে। নিয়মিত এলোভেরার রস বা জুস পান করলে আপনার হজম জনিত সমস্যা থেকে খুব সহজেই মুক্তি পেতে পারেন। পাশাপাশি এটি পরিপাক ও রেচন যন্ত্রকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মুক্ত রাখে। যা আপনার পেটে ক্ষতিকর কৃমি হওয়া থেকেও বাঁচায়।

৩. ফেসওয়াশ হিসেবে এলোভেরা ব্যবহার

স্কিনের উজ্জ্বলতা ও ফ্রেশনেস এর জন্য নানা ধরনের ফেস ওয়াশ ব্যবহার করতে দেখা যায়। আপনি এলোভেরার জেল ব্যবহার করতে পারেন। পরিস্কার হাতে সামান্য বা পরিমাণ মতো জেল নিয়ে আঙুলের সাহায্যে মুখের স্কিনে লাগান। কিছু সময় রেখে পরিস্কার পানি দিয়ে ভাল করে মুখ ধুয়ে ফেলুন।

৪. স্কিন টোনার হিসেবে

মুখের স্কিনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি কিংবা ফর্সা হওয়ার জন্য টোনারের বেশ সুনাম রয়েছে। এলোভেরার সাহায্যে স্কিন টোনার তৈরি করার জন্য ২ চামচ পানি এবং এক চামচ অ্যালোভেরা জেল নিয়ে একটি পরিষ্কার বোতলে মুখ বন্ধ করে ফ্রিজে (নরমালে) রাখুন। টোনারটি ব্যবহারের আগে ভালোভাবে ঝাঁকিয়ে নিন।

৫. পোকা মাকড়ের কামড়ের চিকিৎসায়

আমরা অনেক সময় বিভিন্ন পোকা মাকড়ের কামড়ের দ্বারা আক্রান্ত হই। অনেক সময় এ থেকে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া ও ক্ষত তৈরি হয়। ক্ষতিগ্রস্থ স্থান পরিষ্কার পানি ও স্যাভলোন দিয়ে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন। এবং পেপার তোয়ালে দিয়ে মুছে নিন। এবং ক্ষত স্থানে অ্যালোভেরার জেল দিয়ে কাভার করে রাখুন। ১৫ থেকে ২০ মিনিট রাখুন। প্রয়োজনে পুনরায় ব্যবহার করুন।

৬. চুলের যত্নে এলোভেরা

চুলের যত্নে এলোভেরার ব্যবহার বেশ পুরনো। আজকাল ফেসিয়াল সামগ্রীর অন্যতম কাচামাল এলোভেরা। ত্বকের যত্নের পাশাপাশি চুলের যত্ন ও চুল পড়া কমাতে বেশ কার্যকরী। চুল পরিষ্কার করতে ও এতে পুষ্টি যোগাতে এলোভেরার রস ব্যবহার করতে পারেন। চুলের যত্নে সপ্তাহে দুই দিন সমপরিমান এলোভেরা তেলের সাথে সমপরিমান মধু ভালোভাবে মিশিয়ে চুলের আগা ও গোঁড়ায় ম্যাসাজ করুন। এক ঘণ্টা পর মাইল্ড কোন শ্যাম্পু দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। এটি আপনার চুল পরে যাওয়া কিংনা ডগা ফাটার সমস্যা থেকে রক্ষা করবে।

এলোভেরা দিয়ে চুলের যত্নে- এক চা চামচ পরিমাণ মুলতানি মাটি, ১ চা চামচ আমলকীর রস (বাজারে তেল কিনতে পাওয়া যায়), ১ চা চামচ মধু, একটি ডিম, ও এ চামচ এলোভেরা জেল নিয়ে ভাল করে একটি মিশ্রণ বানিয়ে নিন। এই মাস্ক সপ্তাহে এক দিন করে চুলে ব্যবহার করুন।

৭. জ্বালাপোড়া কমতে

ন্যাশনাল লাইব্রেরী অভ মেডিসিন এর তথ্যমতে ২০১৩ সালে ৫০ জন মানুষের উপর একটি সমীক্ষায় দেখা যায় আংশিক জ্বালাপোড়ার চিকিৎসায় যেখানে জ্বালাপোড়া কমাতে ব্যবহার সিলভার সালফাদিয়াজাইন ক্রমের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ বেশি লোকের চেয়ে বেশি ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। পাশাপাশি এটি লালছে ভাব, চুলকানি ও সংক্রমণ প্রতিরোধেও সাহায্য করে। এছাড়া পোড়া জনিত ক্ষত সারাতেও এর ব্যবহার বেশ কার্যকরী। পোড়া স্থানে এলোভেরার উপরে থাকা ছাল তুলে ভিতরের পিচ্ছিল অংশ দিয়ে আস্তে আস্তে ঘষুন বা লাগিয়ে রাখুন।

এলোভেরা শরবত বা জুস বানানোর নিয়ম

আপনি চাইলে এলোভেরা শরবত বা জুস বানিয়ে বাসায় পান করতে পারেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক বাসায় বসে কিভাবে স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে এলোভেরার জুস বা শরবত বানাতে পারেন সে সম্পর্কে-

পুষ্টিকর এলোভেরা জুস বানাতে যা যা লাগবে– একটি বা ২ টি পাতা, ২ টেবিল চামচ লেবুর রস, মধু ১ বা ২ চামচ, ১ চা চামচ গুড় (না থাকলে চিনি) পরিমানে কম নেওয়া ভালো, প্রয়োজন মতো ঠাণ্ডা পানি, আধা চা চামচ কালো জিরা, পরিমাণ মতো লবন বা বিট লবন।

এলোভেরা জুস প্রস্তুতপ্রণালী- প্রথমে পাতার নিচের অংশ কেটে হলুদ কষ ঝরিয়ে নিন। এবং পাতা দুই ভাগে ভাগ করে বা একপাশ থেকে সবুজ আবরন তুলে চামচের সাহায্যে পরিষ্কার পাত্রে জেল আলাদা করে নিন। এই জেলের মধ্য লেবুর রস, মধু, গুড়, ঠাণ্ডা পানি, কালোজিরা, পরিমান মতো লবন দিয়ে ব্লেন্ডারে সাহায্যে বেন্ড করে নিন। ঠিক এভাবে আপনি বাসায় এলোভেরা শরবত বা জুস বানিয়ে ফেলতে পারেন।

এলোভেরা চাষ

বাজারে ভাল চাহিদা ও অধিক মুনাফা লাভ করা যায় বলে অনেকেই আজকাল কমার্শিয়াল ভাবে এলোভেরা চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। অনেকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশেও এলোভেরা রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। আপনি চাইলে ছোট পরিসরে কিংবা বড় পরিসরে এলোভেরা চাষ করতে পারেন। চলুন এ পর্যায়ে এলোভেরা চাষ পদ্ধতি, জমি তৈরি, চারা রোপণ, পরিচর্যা ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

১. মাটি নির্বাচন

বাংলাদেশের প্রায় সব মাটিতেই এলোভেরা চাষ করা যায়। তবে দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি এলোভেরা চাষের জন্য বেশি ভালো। এছাড়াও খেয়াল রাখতে হবে চাষের জন্য যে জমি নির্বাচন করলেন সেখানে যেন পানি না জমে। অর্থাৎ সু-নিষ্কাসিত  উচু জমি হতে হবে। পাশাপাশি এটাও খেয়াল রাখতে হবে জমিতে যেন সারাদিন রোদ পরে। ছায়াযুক্ত স্থানে এলোভেরার ফলন ভালো হয় না।

২. এলোভেরা চাষের জন্য জমি যেভাবে তৈরি করবেন

জমি নির্বাচনের পর চাষের জন্য জমি উপযুক্ত ভাবে তৈরি করতে হবে। চাষের জমি প্রথমে ভাল ভাবে পরিষ্কার করে নিবে অর্থাৎ কোন আগাছা কিংবা ঘাস থাকলে সেগুলো নিরারি দিয়ে নিতে হবে। এর পর প্রতি ১ হেক্টর জমিতে ১০ থেকে ১২ টন গোবর সার মিশিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতি হেক্টর জমিতে ২৫০ কেজি টিএসপি সার, ৮০ থেকে ১০০ কেজি এমওপি সার দিয়ে দিয়ে ট্রাক্টরের সাহয্যে জমি চাষ দিয়ে বেড তৈরি করে নিতে হবে। দুই পাশ থেকে মাটি টেনে দেড় থেকে আড়াই মিটার চওড়া করে এক একটি বেড তৈরি করে নিন। প্রতিটি বেডের মাঝে  ৮০ সেমি নালা রাখুন। ঠিক আলু চাষের মতো।

৩. চারা রোপণের নিয়ম

আপনি যদি বেশি ফলন পেতে চান তাহলে প্রথমে পুরনো গাছে গোড়া থেকে গজানো চারা আলাদা করে একখন্ড জমি প্রস্তুত করে বীজতলা বানিয়ে সেখানে দুই তিন মাস লালন পালন করে পরে মূল জমিতে রোপণ করুন। এবং ৫ থেকে ৬ মাস অপেক্ষা করে পাতা তোলা শুরু করুন। আপনি রুট সাকারও কিনতে পাবেন। আবার পুরনো গাছের মোথা কেটে বাদ দিয়ে পুরনো গাছও লাগানো যায়।

কোথায় এলোভেরা চারা কিনতে পাওয়া যায়?

আপনার নিকটস্থ সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সামাজিক বনায়ন বাগান কেন্দ্র থেকে এলোভেরা চারা কিনতে পারেন। এছাড়া এলোভেরা চাষ করে এমন কারো কাছ থেকেও কিনতে পারেন।

৪. কোন সময়ে এলোভেরা চারা রোপন করা উচিত?

মূলত জুন কিংবা আষাঢ়ের শুরুতে চারা রোপণ করলে বেশি ফলন পাওয়া যায় ও চারা দ্রুত বড় হয়। তবে কার্তিক অগ্রাহয় মাসে চারা লাগানো হয় কেননা। শীতের সময়ে এলোভেরা পাতার চাহিদা থাকে না। আর এই সময় চাষিরা পাতা সংগ্রহ থেকেও বিরত থাকে। শীত শেষে বসন্তে গাছে নতুন পাতা গজাতে শুরু করে।

৫. সার প্রয়োগের নিয়ম

একটি এলোভেরা গাছ প্রায় ২ বছর পর্যন্ত থাকে। তবে খেয়াল রাখতে হবে প্রথম বছরের মতো ২য় বছরও জমিতে একই হারে সেচ ও সার দিতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত সেচ প্রয়োগ করতে হবে।

৬. পাতা সংগ্রহ ও বিক্রি

বছরে প্রায় ৯ থেকে ১০ মাসই এলোভেরা পাতা সংগ্রহ করা যায়। সারা বছর জুড়ে এই গাছ থেকে নতুন পাতা গজায়। ৫০ টি পাতা একেকটি আটিকে গাইট বলে। আর এক একটি গাইট ৩০০ টাকা থকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। আপনি যদি এক বিঘা জমিতে এলোভেরা চাষ করেন তবে বিঘা প্রতি দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকার এলোভেরা পাতা বিক্রি করতে পারবেন।

সর্বশেষ

সম্মানিত ভিজিটর, এলোভেরা খুবই উপকারি একটি উদ্ভিদ। আপনি চাইলে বেলকনিতে বা বারান্দায়, বাড়ির উঠানে, কিংবা আপনার সবজি খেতের পাশে কয়েকটি এলোভেরা চারা রোপণ করে আপনার ও আপনার পরিবারের সদস্যদের জন্য এলভেরার ব্যবস্থা করতে পারেন। পাশাপাশি আপনার স্থানীয় উদ্যোক্তা থাকলে তাদেরও উৎসাহ দিন।

Spread the love