https://tipswali.com/wp-content/uploads/2021/02/drinks-to-loss-weight.jpg

একটু আরাম করে শুয়ে বসে থাকতে থাকতে হুট করে কখন যে পেটের ভুঁড়ি বেড়ে গেল টেরই পেলাম না। তবে এই নয় যে পেটের এই মেদ কমানো যাবে না। নিয়মিত কিছু খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চার মাধ্যমে পেটের মেদ কমানো সম্ভব। প্রিয় ভিজিটর আজকের লেখা জুড়ে কথা হবে পেটের মেদ কমানোর সহজ একটি উপায় নিয়ে। আর তা হচ্ছে কিছু ড্রিংকস বা পানীয় নিয়ে। যা আপনাকে ম্যাজিকাল ভাবে আপনার পেটের মেদ বা ভুঁড়ি কমাতে সাহায্য করবে।

বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই মেদযুক্ত দেহ, ওবেসিটি বা বাড়তি ওজনের সমস্যা চোখে পড়ে। আমাদের আশেপাশে প্রায় ৪০% মানুষ এ সমস্যার শিকার। মেদ কমাতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে আমরা চারিদিকে খুঁজতে থাকি দ্রুত ওজন কমানোর টিপস। তবে ফিজিসিয়ানদের মতে ওজন কমানোর সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি হল সময় নিয়ে ধীরে ধীরে খাদ্য নিয়ন্ত্রণে আনা ও প্রচুর ব্যায়াম করা। এই পদ্ধতি মেনে চললে মেদ কমার পাশাপাশি ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেশার, হৃদরোগ কিংবা স্ট্রোকের মত রোগের ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।

কঠিন খাদ্যের পাশাপাশি তরল পানীয় যদি হয় ক্যালরিমুক্ত, তবে তো সোনায় সোহাগা। তাই পানীয় পানের পূর্বে তাতে বিদ্যমান ক্যালরি ও ফ্যাটের পরিমাণ জেনে নেওয়া আবশ্যক। তবে দেরী না করে চলুন জেনে নেওয়া যাক প্রতিদিনের খাদ্য চাহিদা মেটাতে, ক্ষুধা কমাতে ও হাইড্রেটেড থাকতে কি কি পানীয় পান করতে পারেন এবং তাদের অন্যান্য উপকারিতা সম্বন্ধে:

ওজন কমাতে পান করুন স্বাস্থ্যকর ১০ পানীয়:

১) মেদ কমাতে পানি পান করুন

অনেকের মধ্যে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হল, যেহেতু পানিতে কোন ক্যালরি বা পুষ্টি উপাদান নেই, এটি পান করা কিংবা না করা ওজন হ্রাস করাতে কোন ভুমিকা রাখে না। খাওয়ার আগে পানি পান করলে এটি ক্ষুধা কিছুটা কমিয়ে দিয়ে খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ কমায়। ফলে ওজন বাড়ার ঝুঁকি কমে যায়। সায়েন্টিস্টরা মনে করেন, আপনার ওজন ২০০ পাউন্ড হলে তার অর্ধেক পরিমাণ পানি (আউন্সে) অর্থাৎ ১০০ আউন্স (প্রায় ১২ গ্লাস) পানি পান করা উচিত। প্রতিদিন কমপক্ষে ৮ গ্লাস পানি পান করা ভালো। কেননা পানি কিডনি ও লিভার সুস্থ রাখে, কোষ্ঠ কাঠিন্য দূর করে, দেহকে হাইড্রেটেড রাখে ও ক্ষুধা কমায়। এছাড়া পানি পানের ১০ মিনিটের মধ্যে আমাদের ‘রেস্টিং এনার্জি এক্সপেন্ডিচার’ ২৪% থেকে ৩০% বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ আমাদের ক্যালরি বার্নের হার বৃদ্ধি পায় ও আমাদের ফিট থাকতে সহায়তা করে।

২) গ্রিন টি

এতে বিদ্যমান দুইটি উপাদান- অ্যান্টি অক্সিডেন্ট (ক্যাটেকিন) ও ক্যাফেইন ওজন কমানোর পথ্য হিসেবে কাজ করে। এটিও ক্যালরি এক্সপেন্ডিচার বাড়িয়ে ক্যালরি ক্ষয়ে ভুমিকা রাখে। ১ কাপ গ্রিন টিতে ২৪ মিগ্রা থেকে ৪০ মিগ্রা ক্যাফেইন থাকে। এটির অন্যতম উপাদান এপিগ্যালোক্যাটেকিন গ্যালেট (Epigallocatechin Gallate; EGCG) আমাদের দেহের মেটাবোলিজম রেট বাড়িয়ে দেয় ও শরীরের অতিরিক্ত চর্বি ভাঙতে ভুমিকা রাখে।

৩) লেবু পানি ও জিরা পানি

লেবু পানি যদিও মেটাবোলিজম হার বাড়ায় না কিংবা শরীরকে ডিটক্সিফাই করে না, এটিতে বিদ্যমান ভিটামিন সি ইমিউনিটি সিস্টেমকে শক্তিশালী করে, আয়রন অ্যাবজরবসনের হার বাড়ায় ও বিভিন্ন রকমের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। এটি লো ক্যালরিযুক্ত পানীয়, যা মেদবৃদ্ধি করে না।

জিরা পানির অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি ইনফ্লেমেটোরি প্রপার্টি ও থারমোকুইনন ব্লাড সুগার ও ব্যাড কোলেস্টেরলের (LDL) পরিমাণ কমায়। জিরার ওয়েট লস সাপ্লিমেন্টসমূহ (Weight Loss Supplement) ওজন কমাতে সাহায্য করে।

৪) আদা চা 

আদা মূলত ওজন কমানোর থেকে, মেদ কমাতে বাধা সৃষ্টিকারী উপসর্গগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করার জন্যই পরিচিত। আদার অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি ইনফ্লেমেটোরি প্রপার্টি হার্টের ড্যামেজসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে। এটিতে বিদ্যমান ‘জিঞ্জারোল’(Gingerol) নামক উপাদান ব্লাড সুগার ও ব্যাড কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়াও খাবারের আগে আদা পানি বা আদা চা পান করলে পেট ভরা থাকে ও ক্ষুধা কম লাগে।

৫) অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার

এটির প্রধান উপকরণ হল অ্যাসেটিক এসিড (Acetic Acid)। এই এসিড মেটাবোলিজম বাড়ায়, ইনসুলিনের লেভেল হ্রাস করে ও কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের ইচ্ছা দমন করে। পানীয়ে সামান্য কয়েক চামচ অ্যাপেল সাইডার ভিনেগারের উপস্থিতি পেট অনেকক্ষণ যাবত ভরিয়ে রাখতে ও ক্ষুধা দমন করতে সক্ষম।

 ৬) ব্ল্যাক টি ও হোয়াইট টি

প্রতি কাপ ব্ল্যাক টিতে ৪৭ মিগ্রা ক্যাফেইন থাকে, যা মেটাবোলিজমের হারকে দ্রুতগামি করে। এছাড়া এতে প্রচুর পলিফেনল (Polyphenol) থাকে। এই পলিফেনল খাদ্যের ক্যালরির পরিমাণ হ্রাস করে, পাকস্থলিতে উপকারি ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি করে। ফলে দেহের অতিরিক্ত চর্বি ভাঙতে শুরু করে ও শরীর ফিট থাকে।

হোয়াইট টি তে প্রচুর ক্যাফেইন ও এপিগ্যালোক্যাটেকিন গ্যালেট (Epigallocatechin Gallate; EGCG) থাকে যা নতুন মেদ কোষ সৃষ্টিতে বাধা দেয়। এটি মেটাবোলিজমকে দ্রুতগামী করে ও মেদ ভেঙে এনার্জিতে রুপান্তর করে।

৭) প্রোটিন শেক মেদ কমাতে বেশ কার্যকরী

প্রোটিন পাউডার এক ধরণের ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট (Macronutrient) যা আমাদের পাকস্থলি পরিপূর্ণ রাখার অনুভুতি যোগায়। এটি আমাদের দেহের জিএলপি-১ (GLP-1) হরমোনকে উদ্দীপ্ত করে, ফলে খাদ্য গ্রহণের ইচ্ছা দমিত থাকে। এছাড়া ঘ্রেলিন (Ghrelin) হরমোন কমায়, যা আমাদের খাদ্যের ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই ঘোল, মটর, হেম্প, চালের প্রোটিন ইত্যাদি লো ক্যালরি প্রোটিন উপাদান খাদ্যতালিকায় যুক্ত করলে দেহের অতিরিক্ত ওজন কমে।

৮) ফল ও ভেজিটেবল জুস

ফল ও ভেজিটেবল জুস ভিটামিন ও পুষ্টির আধার। আঙ্গুর, আম, স্ত্রবেরি, শসা, সিনামন, ক্রেনবেরি, কমলা, তরমুজ ইত্যাদি ফলের জুস ওজন কমাতে বেশ উপকারি। তরমুজের জুসে এল সিটরুলিন (L-Citrulline) নামক অ্যামিনো এসিড থাকে যা মাসেলের ল্যাকটিক এসিড (Lactic Acid) দূর করে, মাসেল পেইন ও ফ্যাটিগ দূর করে। ফলে বেশিক্ষণ ব্যায়াম ও খেলাধুলা করা যায়। এতে করে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।  

শাকসবজির আঁশ বা ফাইবার পাকস্থলির খাবার অনেকক্ষণ ধরে রাখতে সক্ষম। ফলে ক্ষুধা কম লাগে। এছাড়া ভেজিটেবল জুস লো কারব ড্রিঙ্ক হওয়ায় এটি ক্যালরির পরিমাণ বাড়ায় না।

৯) মেদ কমাতে কফি

প্রতি কাপ কফিতে ৯৫ মিগ্রা ক্যাফেইন থাকে। এই ক্যাফেইন ক্যালরি বার্নের পরিমাণ বৃদ্ধি করে দেহকে মেদহীন রাখে। কফির থিওব্রোমিন (Theobromine), থিওফাইলিন (Theophylline) ও ক্লোরোজেনিক এসিড (Chlorogenic Acid) মেটাবোলিজমকে সচল ও দ্রুতগামী করে। বলা হয়, প্রতিদিন ৪ কাপ কফি পান করলে দেহের ৪% ফ্যাট কমে যায়। এছাড়া কফি টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়।

১০) নারকেলের পানি

মেদ কমাতে খাবারে লাগাম টানার পাশাপাশি ব্যায়াম বা খেলাধুলার বিকল্প নেই। এক্সারসাইজ করার পর অনেকেই তৃষ্ণা মেটাতে স্পোর্টস ড্রিঙ্কস খেয়ে থাকেন। কিন্তু এতে প্রচুর সুগার ও ক্যালরি থাকায় কোন ফল পাওয়া যায়না। এক্ষেত্রে পানিতেই সবচেয়ে ভালো ও কার্যকরী ফল পাওয়া যায়। কিন্তু দেহে ইলেক্ট্রোলাইটসের (Electrolytes) ঘাটতি দূর করতে নারকেলের পানির জুড়ি নেই। এটি শরীরকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি ডায়েটকেও কার্যকর রুপ দেয়। এটির লো ক্যালরি দেহকে তাৎক্ষনিকভাবে হাইড্রেটেড করে।

এছাড়া পানিতে সাইলিয়াম হাস্কের মিশ্রণ (Psyllium Husk in Water), টারট চেরি জুস (Tart Cherry Juice) বা আজওয়াইন ওয়াটারও (Ajwain Water) ওজন কমাতে সহায়ক। যদিও, বাংলাদেশে এগুলো সচরাচর পাওয়া যায়না।

উপরোক্ত স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু পানীয়গুলো থাকতে, সফট ড্রিঙ্কস কিংবা হার্ড ড্রিঙ্কস কেন পান করবেন? তাই এসব উচ্চ ক্যালরি যুক্ত পানীয় আজই পরিহার করুন। এছাড়া সুগার ও তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। ভাজা পোড়া ও ফাস্ট ফুড খাওয়া ছেড়ে দিন। স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার গ্রহণ করুন।

খাবারে কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাটের পরিমাণ কমিয়ে প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলকে জায়গা দিন। খাদ্য তালিকায় প্রচুর ফলমূল ও শাকসবজি যোগ করুন। হাইড্রেটেড থাকতে প্রচুর পানি পান করুন। বারবার অল্প পরিমাণে খাবার খেয়ে পেট ভরা রাখুন। কেননা বেশি ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাবার নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, খাবার নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি প্রচুর এক্সারসাইজ ও খেলাধুলা করা। ব্যায়াম ফ্যাট ও ক্যালরি বার্নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, সুন্দর থাকুন।

সম্মানিত ভিজিটর বাংলা ভাষায় স্বাস্থ্য, বিউটি, ফ্যাশন টিপস পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন আপনাদের প্রিয় টিপসওয়ালী ডট কম।

আরও পড়ুনঃ ওজন কমানোর ৫ টি টিপস

লিখেছেন: মেহজাবিন

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.