https://tipswali.com/wp-content/uploads/2021/04/fenugreek.jpg

খাদ্য, রূপচর্চা কিংবা চিকিৎসার জন্য মেথি আমাদের দেশের গ্রাম থেকে শহর সব অঞ্চলের মানুষের  কাছে সমান বহুল পরিচিত একটি নাম।

প্রিয় পাঠক, আজকের লেখাজুড়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে, মেথি কি, ব্যবহার, উপকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, খাওয়ার নিয়ম, রেসিপি, তেল, রূপচর্চায় ও চুলে মেথির ব্যবহার, দাম, কোথায় কিনতে পাওয়া যায়,  করা হয় সহ অন্যান্য বিষয়।

মেথি কি?

ইংরেজিতে Fenugreek যার বাংলা অর্থ মেথি গাছ। মেথি হচ্ছে ক্লোভারের মতো এক ধরনের ঔষধি। মূলত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এর উৎপাদন বেশি হয়। এটি মূলত এক ধরনের মৌসুমি গাছ। এর স্বাদ তিতা এবং বছরে মাত্র একবার ফুল ও ফুল থেকে ফল হয়। মূলত এর পাতা শাক হিসেবে খাওয়া হয়, এর বীজ রূপচর্চায় ও ইউনানী চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

মেথির গুনাগুন

Fenugreek বা মেথির পুষ্টিগুন শুনলে আপনি অবাক হয়ে যেতে পারেন। এক টেবিল চামচ বা ১১.১ গ্রাম মেথি বীজে প্রায় ৩৫ ক্যালোরি, ৩ গ্রাম ফাইবার, ৩ গ্রাম প্রোটিন, ৬ গ্রাম কার্বস, ১ গ্রাম ফ্যাট। পাশাপাশি এতে রয়েছে আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, ও ম্যাগনেসিয়াম।

মেথির ৬ টি উপকারিতা

পুষ্টিগুন শুনেই আপনি হয়তো এর উপকারিতা সম্পর্কে মোটামুটি ভালো ধারনা পেয়ে গেছেন। সঠিক নিওয়মে এটি খাওয়া হলে এটি আপনার শরীরের জন্য হতে পারেন অত্যন্ত উপকারী। কথা না বাড়িয়ে চলুন এর নানা উপকারিতা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাকঃ

১. নতুন মায়েদের জন্য

মায়ের দুধে রয়েছে সর্বোচ্চ পুষ্টি উপাদান। তবে অনেক মায়েরা বিশেষ করে যারা প্রথমবারে সন্তান প্রসাব করে তারা তাদের বাচ্চার জন্য পর্যাপ্ত বুকের দুধ সরবরাহ করতে পারেন না।

পিডিয়েটিক সাইন্স জার্নালের এক উদ্ধৃতি দিয়ে হেলথলাইন জানান এক বিশেষ গবেষণা দেখা যায় যে ভেষজ হারবাল চায়ের সাথে মেথি বীজ দিয়ে চা পান করলে মায়েদের বুকের দুধের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। তারা ৭৭ জন মায়েদের উপর ১৪ দিন ধরে একটি গবেষণা করে এই ফলাফলা পায় বলে দাবি করে।

২. ওজন কমাতে মেথি

আমাদের মধ্যে যাদের ওজন বেশি তাদের বেশিরভাগেরই বেশি ক্ষুদা লাগার সমস্যা রয়েছে। “মেডিকেল নিউজ টুডে” এর ২০১৫ সালের একটি স্টাডিতে দেখা যায় যারা দুপুরের খাবারের আগে একগাস মেথি চা পান করেছিল তারা অন্যদের তুলনায় কম ক্ষুধার্ত ও অল্প খেয়ে তৃপ্ত। যেখানে তারা ৯ জন অতিরিক্ত ওজনের কোরিয়ান মহিলাদের উপর এই গবেষণা চালান।

৩. টেস্টোস্টেরন এবং শুক্রাণু বাড়াতে

বিশেষজ্ঞদের মতে মেথি টেস্টোস্টেরন ও শুক্রাণুর সংখ্যা বাড়াতে সহায়তা করে। “ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অভ মেডিকেল সায়েন্স” এর ২০১৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায় ৫০ জন পুরুষ স্বেচ্ছাসেবক ১২ সপ্তাহের জন্য মেথি বীজের নির্যাস পান করে। এবং তাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশের বীর্যের পরিমান বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও এটি ধারাবাহিকভাবে মানসিক সতর্কতা, লিবিডো ও মেজাজের উন্নতি করে।

৪. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মেথি

আমাদের দেশের বিশেষ করে বয়স্ক বা প্রবীণদ ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। কয়েকটি গবেষণায় দেখা যায়, মেথির কমপক্ষে চারটি যৌগের অ্যান্টিডায়াবেটিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি অন্ত্রের গ্লুকোজ শোষণ হ্রাস, গ্যাস্ট্রিক খালি করতে বিলম্ব, ইনসুলিনের কার্যকরীতার উন্নতি ও লিপিড-বাইন্ডিং প্রোটিন ঘনত্ব হ্রাস করে।

৫. উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টের ঝুঁকি হ্রাস

মেথি কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ত চাপের উন্নতি করতে সাহায্য করে। যা আপনার হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারে। কার্বন মেথির বীজে প্রায় ৪৮ শতাংশ ফাইবার থাকে ডায়েট্রি ফাইবার হজম কতে একটু বেশি সময় লাগে এবং অন্ত্রের মধ্যে একটি সান্দ্র জেল তৈরি করে যা চিনি এবং চর্বি হজম করতে কঠিন করে তোলে।

এছাড়াও গ্যাস্টিক, আলসার, শরীর ব্যাথা, ফোঁড়া, শ্বাসকষ্ট, কাটা ঘা, মাইগ্রেন বা মাথা ব্যাথা, ও প্রসব বেদনা কমাতে মেদি দারুন কাজ করে।

মেথি খাওয়ার নিয়ম

মেথির নানা গুনাগুন তো জানলেন! আপনি জানেন কি যে কীভাবে মেথি খেতে হয়। চলুন মেথি খাওয়ার সঠিক নিয়ম জেনে নেওয়া যাকঃ

ভালো ফলাফল পেতে ৪ টি উপায়ে খাওয়া যেতে পারে। ওজন কমানোর জন্য সারা রাত ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে চিবিয়ে খাওয়া যায়। সালাদ এর সাথে খাওয়া যেতে পারে। শুকনো মেথির বীজ শুকিয়ে গুঁড়ো করে মাংসে ছিটিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও একে গ্রাইন্ড করে কারীর সাতে যোগ করতে পারেন।

মেথির রেসিপি

বাসায় বসে ঝটপট কয়েকটি মজাদার মেথির রেসিপি ট্রাই করে ফেলতে পারেন।

রেসিপি-১. মেথি চিকেন

সাধারণত আমরা যেভাবে মুরগি রান্না করি এর সাথে রান্না শেষ হওয়ার আগে অর্থাৎ ব্লক আসলে এর মধ্যে আপনার পছন্দ মতো মেথি পাতা দিয়ে দিন। যা এর পুষ্টিগুন আরও কয়েকগুন বাড়িয়ে তুলবে ও হৃদপিণ্ডের জন্য খুবই উপকারী।

রেসিপি-২. মেথি পরোটা

সকালের নাস্তায় পরোটা ছাড়া একদমই চলে না আমাদের মধ্যে এমন মানুষের সংখ্যা কম নয় কিন্তু। তবে সকালে তেলযুক্ত পরোটা যদি একটু স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর করে নেওয়া যায় খারাপ বা কিসে। পরোটার ময়াদার সাথে মেথির পাতা কুচিকুচি করে মিশিয়ে পরোটা তৈরি করে দই বা আচার অথবা ভাজির সাথে খেতে বেশ সুস্বাদু লাগে।

ত্বকের যত্নে মেথি

শরীরে পুষ্টি সরবরাহের পাশাপাশি মেথি আপনার ত্বকের জন্যও সমানে উপকারী। ত্বক উজ্জ্বল করতে কিংবা চখের নিচের কালো দাগ দূর করতে এর বিশেষ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। চলুন রূপচর্চায় ও ত্বকের যত্নে মেথির কয়েকটি ব্যবহার ও কয়েকটি ফেসপ্যাক সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাকঃ

১. ত্বকের উজ্জ্বলতা আনতে

মেথির বীজে রয়েছে ভিটামিন সি। যা আপনার ত্বকের রং কে হালকা করে এবং একটি সুন্দর আভা এনে দেয়। মুখে গ্লো আনার জন্য একটি কাপে বা বাটিতে পরিমান মতো মেথি নিয়ে ভিজিয়ে রাখুন ১-২ ঘণ্টা ভিজিয়ে বেলেন্ডার দিয়ে বা বেটে পেস্ট তৈরি করে নিন।

এরপর ফেসিয়াল মাস্ক হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। আরও বেশি ভালো ফলাফল পেতে একচামচ বীজের গুঁড়োর সাথে দুধ মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করতে পারেন।

২. ত্বক পরিষ্কার করতে

আমাদের অনেকের ত্বকেই তেলতেলে ভাব দেখা যায়। আর ত্বকের তেলতেলে ভাব দূর করতে একই পদ্ধতিতে সারা রাত ভিজিয়ে রেখে বীজ দিয়ে পেস্ট তৈরি করে মুখের ত্বকে ফেসিয়াল মাস্ক হিসেবে ব্যবহার করুন।

আপনি চাইলে ভেজানো পানি ফেলে না দিয়ে পরিষ্কার তুলোর সাহায্যে আলতো করে স্কিন পরিষ্কার করতে পারেন।

৩. রোদে পোড়া দাগ দূর করতে

সারাদিন বাহিরে থাকলে আমাদের স্কিনে রোদের কারনে কালো দাগ হয়ে যায়। রোদে পোড়া দাগ দূর করতে দুই টেবিল চামচ পরিমান মেথি ভালো করে ধুয়ে দুই-তিন গ্লাস পানিতে সিদ্ধ করুন। সিদ্ধ করা পানি পরিষ্কার বোতলে করে ফ্রিজে রেখে ঠাণ্ডা করে নিন। এই পানি হতে এক চা-চামচ পানি ও এক চা চামচ অলিভ ওয়েল এর সাহায্যে একটি মিশ্রণ তৈরি করে নিন। প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে আপনার মুখের ত্বকে ও গলায় ও হাতে মেখে ঘুমিয়ে পড়ুন। এভাবে এক মাস নিয়মিত করলে আপনার স্কিনের রোদে পোড়া দাগ দূর হবে।

৪. স্কিন মশ্চারাইজ

আপনার স্কিন যদি রুক্ষ, শুকনা কিংবা আঠালো হয়ে থাকে তবে আপনি মেথির বীজের ফেসিয়াল মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। এজন্য রাতে সামান্য গরম পানিতে এক চা চামচ মেথির বীজ বিজিয়ে রাখুন এবং সকালে এক টেবিল চামচ মধু ও দুই টেবিল চামচ মধু দিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। এবং এই প্যাকটি আপনার মুখে লাগান ও ১৫ মিনিট পর পরিষ্কার ঠাণ্ডা পানিদিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

চুলে মেথি ব্যবহারের নিয়ম

ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি চুলের যত্নেও মেথির বিশেষ ব্যবহার দেখা যায়। তবে আপনি যদি একদম প্রথমবার মেথির তেল ব্যহাকারী হয়ে থাকেন। তবে প্রথমে অল্প পরিমান দিয়ে শুরু করে দেখুন। এটি আপনার সাথে যাচ্ছে কিনা। আপনি যদি এই তেল ব্যবহারের পর জ্বালা বা লালভাব লক্ষ করে তবে ধরে নিন এই তেল আপনার সাথে যাচ্ছে না। এবং তেল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

আপনি চাইলে পরিমান মতো মেথি ভালো করে ধুয়ে একগ্লাস বা ছোট বটিতে রাতে পানিতে ভিজিয়ে রেখে  পড়ে দিন সকালে একটি বোতলে নিয়ে চুলের গোঁড়ায় স্প্রে করতে পারেন এতে চুল বাড়ে। যদিও এনিয়ে বিশ্বস্ত কোন গবেষণার খবর পাওয়া যায় নি। (প্রচলিত পদ্ধতি)।

মেথির হেয়ার প্যাক

মেথির তেল ব্যবহার না করে আপনি চাইলে হেয়ার প্যাক ও ব্যবহার করতে পারেন। হেয়ার প্যাক তৈরি করার জন্য ১ এক টেবিল চামচ বীজ নিয়ে ভালো করে ধুয়ে একগ্লাস পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এবার ২ চ-চামচ টক দই নিন। ও ভিজিয়ে রাখা বীজ বেটে দইয়ের সাথে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এই হেয়ার প্যাকটি ২২৫-৩০ মিনিট চুলের গোঁড়ায় লাগিয়ে রাখুন ও অপেক্ষা করুন। এর পর হারবাল শ্যাম্পু ও নর্মাল ঠাণ্ডা পানিয়ে দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। এভাবে সপ্তাহকে ২ মেথির হেয়ার প্যাক ব্যবহার করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

মেথি কোথায় পাওয়া যায়

কসমেটিক্স এর দোকানে, হারবারল বা ইউনানি ঔষধ ফার্মেসী, ও দেশের বিভিন্ন অনলাইন শপে মেথি কিনতে পাওয়া যায়।

মেথির দাম

১ কেজি মেথির গুড়ার দাম ৫০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা। অপরদিকে ১ কেজি মেথি বীজের দাম ২২০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা। (খুচরা মুল্য)। পাইকারি মুল্য কেজি ১২০-১৫০ টাকা।

মেথির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

তবীই পুষ্টিকর ও উপকারী উপদানটির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে স্বাস্থ্যবান মানুষদের জন্য এটি বেশ নিরাপদ।

তবে মেথি খাওয়ায় পর কিছু কিছু মানুষের ডায়রিয়া, বদহজমের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এছাড়াও যাদের আগে থেকেই ক্ষুদা জনিত সমস্যা আছে অর্থাৎ খাবার খেতে মন চায় না। তাদের জন্য এটি এড়িয়ে চলা উত্তম।

সর্বশেষ

মেথি খাওয়া কিংবা ব্যবহারের ফলে কছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তবে সঠিক মাত্রায় এর ব্যবহার নিরাপদ। আপনি যদি প্রথমবার এটি খেয়ে বা ব্যবহার করে থাকেন তবে সামান্য পরিমান দিয়ে শুরু করুন। সমস্যা দেখা না দিলে আস্তে আস্তে খাওয়া কিংবা ব্যবহারের মাত্রা বাড়ান।

সম্মানিত ভিজিটর, আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। কোন প্রশ্ন, মতামত, পরামর্শ কিংবা অভিযোগ থাকলে শেয়ার করতে পারেন আমাদের সাথে। আর উপকারী কিছু পেলে শেয়ার করুন আপনার কছের মানুষদের সাথে।

আরও পড়ুনঃ মুলতানি মাটি সম্পর্কে বিস্তারিত

Spread the love