https://tipswali.com/wp-content/uploads/2021/12/karmasangsthan-bank.jpg

বেকারত্ব দূরীকরণ এবং অর্ধবেকারদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক দীর্ঘদিন যাবত কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত এই ব্যাংকটি ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট ৩৩ টি আঞ্চলিক অফিস বা কার্যালয় এবং ২৪ টি শাখা রয়েছে। মূলত দেশের বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীকে অর্থ সহায়তা দিয়ে ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তুলতে উৎসাহী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বর্তমানে বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক বিভিন্ন কর্মসূচীতে একক ব্যাক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ লক্ষ এবং ৫ জনের গ্রুপের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ টাকা লোন প্রদান করে থাকে।

সম্মানিত ভিজিটর, আজকের লেখাজুড়ে আমি আপনাদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করবো- বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক লোন পদ্ধতি, লোন আবেদন করার ও পাওয়ার উপায়, লোন পাওয়ার যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সুদের হার ও কর্মসংস্থান ব্যাংক লোন সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে।

Table of Contents

কর্মসংস্থান ব্যাংক ঋণ কর্মসূচী সমূহ

বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক ৮ টি কর্মসূচীতে লোন প্রদনা করে থাকে। এগুলো হচ্ছে- নিজস্ব কর্মসূচী, ক্ষুদ্র ব্যবসায় ঋণ কর্মসূচী, বিদেশে কর্মসংস্থান, সকারের বিশেষ কর্মসূচী, কনজুমারস ক্রেডিট স্কীম বা ব্যাক্তিগত (পার্সোনাল) লোন, কম্পিউটার ক্রয় ঋণ, গৃহ নির্মাণ বা হোম লোন এবং মোটর সাইকেল লোন।

আরও পড়ুনঃ সিটি ব্যাংক বাইক লোন সম্পর্কে।

উদ্দেশ্য

বেকার ও অর্ধবেকারদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা তোলা। আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ, দরিদ্র বিমোচনে সহায়তা, জিডিপিতে অবদান বৃদ্ধি, কৃষিপন্য ও কুটির শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহ প্রদান।

যে সকল খাতে লোন প্রদান করা হয়ে থাকে

কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে আপনি নিম্নোক্ত খাতে বিনিয়োগের জন্য লোন নিয়ে আত্মকর্মসংস্থান মূলক কাজ বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় কিংবা শিল্প স্থাপনের কাজে বিনিয়োগ করতে পারেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক কোন কোন খাতে লোন প্রদান করে থাকে-

১) মৎস্য সম্পদ

বিভিন্ন প্রকার মাছ চাষ যেমন- কার্প জাতীয় মাছ, কই, সিং, মিশ্র মাছ, চিংড়ি, পাংগাস, মনোসেক্স তেলাপিয়া, রেণু পোনা উৎপাদন ইত্যাদি এর জন্য বাংলাদেশের বেকার কিংবা অর্ধবেকার উদ্যোক্তাদের জন্য এই লোন সহায়তা প্রদান করা হয়।

২) প্রানিসম্পদ

পশু-পালন, প্রজনন, পশু মোটাতাজা করন, দুগ্ধ খামার স্থাপন, হাস-মুরগির খামার, ও অন্যান্য পশু-প্রাণী বাণিজ্যিকভাবে পালনের জন্য এই লোন প্রদান করা হয়ে থাকে।

৩) পরিহন সেবা

আপনি যদি পরবহন সেবা কিংবা এর সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসায় এর সাথে যুক্ত হতে চান তাহলে আপনি বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে এই লোন পেতে পারেন। মূলত যাত্রী সেবার মান উন্নয়ন, পন্য সরবরাহ, জেলা কিং উপজেলার সাথে গ্রাম অঞ্চলের সহজ যোগাযোগ স্থাপন, পরিবহন খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্দেশ্যে ও বেকারদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য এই ধরনের লোন সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে।

৪) শিল্প-কারখানা স্থাপন লোন

কোন বেকার বা অর্ধবেকার যদি কোন ছোট বা মাঝারি শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে নিজেকে আত্মনির্ভরশীল হতে চায় তাহলে তারা এই ধরনের লোন পেতে পারে। বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক, মাছের হ্যাচারি, কৃষি যন্ত্রপাতি তৈর, বেকারি শিল্প স্থাপন, নারিকেল তেল উৎপাদন, মসলা, সুগন্ধি চাল উৎপাদন, আটা কিংবা ময়দা প্রস্তুতকরন, অয়েল মিল, রাইস মিল ইত্যাদি স্থাপন করে নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলেতে চায় তাদের জন্য এই ধরনের লোন প্রদান করা হয়।

৫) ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপন লোন

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে অন্যতম একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আপনি যদি কোন ছোট কিংবা মাঝারি কুটির শিল্প স্থাপন করে আত্মনির্ভরশীল হতে চান তাহলে আপনি এই ধরনের লোন সহায়তা পেতে পারেন। প্রিন্টিং, মৃৎ শিল্প স্থাপন, মোমবাতি, গোলাপজল, কোয়েল তৈরি, বাঁশ ও বেতের সামগ্রী তৈরি, রাবার প্রক্রিয়া-জাতকরন, শুটকি মাছ প্রক্রিয়াকরন, আইস্ক্রিম কিংবা বরফকল, চামড়াজাত দ্রব উৎপাদন ইত্যাতি কাজের জন্য এই ধরনের ঋণ প্রদান করা হয়।

৬) উৎপাদনশীল প্রকল্প

দেশের বেকার জনগোষ্ঠীকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে বিভিন্ন উৎপাদনশীল প্রকল্প যেমন- সবজি/মাশরুম চাষ, নকশী কাঁথা তৈরি, ফল চাষ ইত্যাদি এর জন্য এই খাতে লোন সেবা দিয়ে থাকে।

৭) সেবা খাতে বিনিয়োগ

বিভিন্ন সেবা খাত যেমন- পার্লার, সেলুন, পাওয়ার ট্রিলার, টিভি, মোবাইল ফোন মেরামত, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দন্ত চিকিৎসা, ক্যাবল অপারেটর ব্যবসায়, কমিউনিটি সেন্টার, সেলাই মেশিন, গাড়ি মেরামত ওয়ার্কশপ, শিক্ষা সেবা ইত্যাদির জন্য বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক লোন প্রদান করে থাকে।

৮) বাণিজ্যিক খাতে বিনিয়োগের জন্য লোন

আপনি যদি একজন বেকার বা অর্ধবেকার হয়ে থাকেন তবে বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে মুদি দোকান, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, কাপড়ের ব্যবসায়, ইলেক্ট্রনিক সামগ্রি, ঔষধ, মাছের ব্যবসায়, ইট-বালি পাথেরে ও অন্যান্য ছোট ব্যবসায় ইত্যাদির জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংক লোনে জন্য আবেদন করতে পারেন।

আরও পড়ুনঃ জনতা ব্যাংক লোন সম্পর্কে

কর্মসংস্থান ব্যাংক লোন পাওয়ার যোগ্যতা

কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে লোন পাওয়ার জন্য আবেদনকারীর নিম্নলিখিত যোগ্যতা থাকতে হবেঃ

  • বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক
  • ব্যাংকের শাখার স্থায়ী বাসিন্দা, স্থায়ী বাসিন্দা না হলে একজন স্থায়ী বাসিন্দার গ্যারান্টি।
  • বেকার বা অর্ধ-বেকার,
  • ১৮ বছর থেকে ৪৫ বছর বয়স
  • কোন প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপী হওয়া যাবে না।
  • যে কোন প্রকল্প পরিচালনায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে লোন পাওয়ার জন্য যে সকল কাগজপত্র ও তথ্যা প্রয়োজন হবে-

  • আবেদনকারী ও গ্যারান্টারের জাতীয় পরিচয় পত্র বা ভোটার আইডি কার্ডের কপি
  • সদ্য তোলা ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের সত্যায়িত রঙিন ছবি।
  • শিক্ষাগত যোগ্যতার সত্যায়িত কপি (প্রয়োজনে)
  • প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেট এর সত্যায়িত কপি।
  • গ্যারান্টারের তথ্য ও সদ্য তোলা ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের সত্যায়িত রঙিন ছবি ।
  • ভাড়া বা লীজ নিয়ে থাকলে যথাযথ প্রমানপত্র/ব্যবস্থাপকের প্রত্যয়ন।
  • প্রকল্প স্থাপনের পূর্বে মালিকের অনুমতি পত্র।
  • যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য লোন হয়ে থাকলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ৩টি দরপত্র (প্রয়োজনে)।
  • ১ লক্ষ বা এর বেশি টাকার উর্ধে লোনের জন্য ট্রেড লাইসেন্সের কপি।
  • ঔষধ বিক্রির জন্য ড্রাগ লাইসেন্সের কপি।
  • আয়-ব্যয় বিবরণী।
  • জমির দলিল পত্র।
  • পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নিকট হতে ছাড়পত্র।

আরও পড়ুনঃ ভোটার আইডি কার্ড ডাউনলোড করার নিয়ম

কর্মসংস্থান ব্যাংকের লোনের সুদের হার

১ বছর বা তার কম সময় পর্যন্ত সুদের হার ০.৪০%, ১ বছরের উর্ধে কিন্তু ২ বছরের কম মেয়াদী লোনের সুদের হার ০.৫০% এবং ২ বছরের উপরে পরিশোধযোগ্য লোনের সুদের হার ০.৬০%।

অনলাইনে বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক লোন আবেদনের নিয়ম

বর্তমানে বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংকে লোনের জন্য অনলাইনে আবেদন করা যায়। তবে আপনি যে এলাকায় বাসিন্দা ওই এলাকার শাখায় সরাসরি আবেদন করা যায়। এ ক্ষেত্রে আবেদন ফরম পূরণ ও নির্ধারিত ফি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।

কর্মসংস্থান ব্যাংকের এই ঠিকানায় গিয়ে– প্রথমে আপনার সম্পূর্ণ নাম, ন্যাশনাল আইডি কার্ড বা ভোটার আইডি কার্ডের নাম্বার, মোবাইল নাম্বার, বাবার নাম, মায়ের নাম, বর্তমান ঠিকানা, গ্যারান্টারের নাম, ভোটার আইডিকার্ড নাম্বার, আপনার জন্ম তারিখ, প্রকল্পের ধরন ও নাম লিখে সাবমিট করুন।

উল্লেখ্য লোনের আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ফি (৩০০ থেকে ৫০০ টাকা) এবং লোন পাশ হলে স্যাম্প খরচ লোন গ্রহীতার নিজের বহন করতে হবে।

সর্বশেষ

সম্মানিত ভিজিটর আশা করছি বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংক লোন পদ্ধতি, সুদের হার, আবেদনের নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে আপনারা বিস্তারিত ধারণা পেয়ে গেছেন। এ নিয়ে আপনার কোন মতামত কিংবা প্রশ্ন থাকলে শেয়ার করতে পারেন আমাদের সাথে।