https://tipswali.com/wp-content/uploads/2021/09/Mohera-Jamidar-House.jpg

যারা ঢাকা শহরের আশেপাশে পরিবার কিংবা বন্ধুদের সাথে একদিনের জন্য ঘুরতে যেতে চান মহেরা জমিদার বাড়ি হতে পারে চমৎকার একটি যায়াগা। ইতিহাস ঐতিহ্যে ভরপুর মহেরা জমিদার বাড়ি রূপশোভা ছড়িয়ে কালের নিদর্শন হয়ে দাড়িয়ে আছে যুগের পর যুগ। পল্লী ছায়া ঘেরা নিরিবিলি, পাখির কলরবে মুখরিত, কোলাহলমুক্ত পরিবেশ আপনাকে দিবে অন্যরকম এক অনুভূতি। নানা নিদর্শনের পাশাপাশি নানা রঙের ফুলের বাগানে পরিবেষ্টিত ও দীঘির পারের দৃশ্য প্রান জুড়িয়ে দেয়।

আমি সরকারি বাঙলা কলেজ এর ছাত্র থাকাকালীন সময়ে আমরা ডিপার্টমেন্ট এর বন্ধু-বান্ধুবিরা মিলে একদিনের জন্য মহেরা জমিদার বাড়ি ভ্রমণে গিয়েছিলাম। সে দিনের কথা মনে করলে হু হু করে ওঠে সবাই কই, ভার্সিটি জীবন প্রায় শেষ আগের মতো হুটহাট আড্ডা দেওয়া হয় না। সবাইকে একসাথে পাওয়াও যায় না। যাহোক মূল কথায় আসি।

সম্মানিত ভিজিটর, আজকের লেখাজুড়ে আমি আপনাদের সাথে আমার নিজের মহেরা জমিদার বাড়ি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে যাচ্ছি। শেয়ার করবো টাঙ্গাইল মহেরা জমিদার বাড়ির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, মহেরা জমিদার বাড়ি যাওয়ার উপায়, বাস ট্রেন ভাড়া, টিকেট মুল্য, কি কি দেখতে পারবেন, হোটেল,খাবার ও এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও উত্তর।

Table of Contents

মহেরা জমিদার বাড়ির ইতিহাস

কালিচরন সাহা ১৮৯০ সালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে মহেরা জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত গ্রামের নাম অনুসারে এই জমিদার বাড়ির নাম। কালীচরন সাহা ও তার ভাই আনন্দ সাহা কোলকাতার বাসিন্দা। তারা জমি কিনতে মহেরা গ্রামে আসেন। পরবর্তী সময়ে জমির মালিকানা সহ তারা এই গ্রামে পাট এবং লবনের ব্যবসায় পরিচালনা করেন। তার বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক ছিলনে। তাদের পরবর্তী প্রজন্ম সবাই রায় চৌধুরী পদবী গ্রহণ করেন।

বলা হয়ে থাকে ওইসময়ে টাঙ্গাইলে মানুষের বসবাস কম ছিল এবং তার ওই এলাকায় রাস্তাঘাট তৈরি, পানি সহবরাহের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি নানা জনকল্যাণকর কাজ করেন। এবং ধীরে ধীরে বিশাল এই ভবন তৈরি করেন। তবে প্রচলিত আছে তারা জমিদারি প্রতিষ্ঠার আগেই ভবনগুলো তৈরি করেছিলেন। দেশ ভাগের পড়ে অনেকেই বাংলা ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমান।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক যোদ্ধারা মহেরা জমিদার বাড়িতে হামলা করেন এবং ওই জমিদার বাড়ির ১ স্ত্রী ও ৫ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করে। এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে জমিদার পরিবার লোহাজং নদী দিয়ে নৌকার সাহায্যে দেশ ত্যাগ করে ভারতে পাড়ি জমায়। এর পড়ে ১৯৮২ সাল হতে বাংলাদেশ পুলিশ ট্রেনিং স্কুল হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৯০ সালে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল, পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে উন্নীত হয়। (অনলাইন হতে সংগৃহীত)

মহেরা জমিদার বাড়িতে যা যা দেখতে পাবেন

মহেরা জমিদার বাড়িতে মোট চারটি ভবন রয়েছে। ভবনগুলোর নাম হচ্ছে- আনন্দ লজ, মহারাজ লজ, চৌধুরী লজ ও কালীচরন লজ। এই সব ভবনগুলো নানা কারুকাজ খচিত ও তৎকালীন জমিদার ও জমিদার পরিবারের ব্যবহৃত নানা জিনিস পত্র যাদুঘরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ভবনগুলোতে মোঘল, সিন্ধু, রোমান নির্মাণ শৈলীর ছাপ লক্ষ্য করা যায়। দেখতে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করতে জমিদার বাড়ির আশেপাশে নানা রঙের চমৎকার ফুল ও ফলগাছ দিয়ে সাজানো হয়েছে।

৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই জমিদার বাড়ির সামনেই রয়েছে বিশাখা সাগর নামে বিশাল বড় এক দীঘি। আর ভবনের পিছনের দিকে রয়েছে পাসরা পুকুর ও রানী পুকুর নামে আরও ২ টি পুকুর। দিঘির পানিতে বিনোদনের জন্য রয়েছে নৌকায় চড়ার ব্যবস্থা। আনন্দ লজের পিছনে রয়েছে কিছু পাখিও বন্য প্রাণীর সংগ্রহ। পাশাপাশি ছোটদের জন্য রয়েছে আলাদা পার্ক। এখানে নাগরদোলা, ট্রেন, স্লিপার, দোলান প্রভৃতি রয়েছে। সমগ্র জমিদার বাড়ি জুড়ে সবুজ গাছপালার সমারোহ এক মায়াময় পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে। পিছনের দিকে খোলা মাঠ রয়েছে যেখানে পুলিশের ক্যাম্প ও ট্রেনিং করানো হয়। দিন দিন সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য আরও নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

মহেরা জমিদার বাড়ি টিকেট মূল্য

শ্রেণীটিকেট মূল্য
জনপ্রতি৮০ টাকা
শিশু পার্ক২০ টাকা
পার্কিং৫০ টাকা
নৌকা ভাড়া১০০ টাকা (বেশি কম হতে পারে)
মহেরা জমিদার বাড়ি টিকেট মূল্য তালিকা

মহেরা জমিদার বাড়ি কিভাবে যাবেন

ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল জেলায় ঐতিহাসিক মহেরা জমিদার বাড়ি অবস্থিত তাই ঢাকা থেকে এখানে যাওয়া অনেক সহজ। ঢাকা থেকে এখানে যেতে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে।

মহাখালী, কল্যানপুর, গাবতলি ও সায়েদাবাদ বাস কাউন্টার হতে ঢাকা টু টাঙ্গাইলগামী যে কোন বাসে টিকেট কাটুন। সময়মতো বাসে উঠে পড়ুন। এই বাসগুলো আপনাকে টাঙ্গাইল নাটিয়াপাড়া বাস স্টেশনে নামিয়ে দিবে। টাঙ্গাইল নাটিয়াপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে লোকাল সিএনজি, বেবি ট্যাক্সি কিংবা অটোরিকশায় চড়ে মহেরা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার বা মহেরা জমিদার বাড়ি আসতে হবে। মহাখালী থেকে বাসে উঠলে ডুবলাই পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে নামিয়ে দিবে এখান থেকে সিএনজিতে করে এখানে যাওয়া যায়।

ঢাকা টু মহেরা জমিদার বাড়ি বাস ভাড়া:

বাস সার্ভিসএসিননএসি
সকাল সন্ধ্যা এন্টারপ্রাইজ২৫০ টাকা
সোনিয়া এন্টারপ্রাইজ২৫০ টাকা
নড়াইল পরিবহন১৬০ টাকা
ঝটিকা১২০ টাকা
ধলেশ্বর পরিবহন১২০ টাকা
ঢাকা টু টাঙ্গাইল বাস ভাড়া তালিকা

ঢাকা টু টাঙ্গাইল ট্রেনে মহেরা জমিদার বাড়ি

ঢাকা টু টাঙ্গাইলগামী ট্রেনের সাহায্যে মহেরা জমিদার বাড়ি যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে ধূমকেতু, সুন্দরবন এক্সপ্রেস, নীলসাগর, একতা এক্সপ্রেস, সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস, লালমনি এক্সপ্রেস, পদ্মা এক্সপ্রেস, চিত্রা এক্সপ্রেস ট্রেনে করে টাঙ্গাইল গিয়ে ট্রেন স্টেশন থেকে সিএনজি, অটোরিকশায় চড়ে জমিদার বাড়ি যেতে পারেন। একেক ট্রেনের স্টেশন ছাড়ার সময় আলাদা। তাই কোন ট্রেন কোন সময়ে টাঙ্গাইল যায় তা আগে জেনে নিন।

ঢাকা টু টাঙ্গাইল ট্রেন ভাড়া

ঢাকা টু টাঙ্গাইল ট্রেনের টিকেটের মূল্য/দাম তালিকা নিচে দেওয়া হল-

সিটভাড়া
শোভন৯০ টাকা
শোভন চেয়ার১০৫ টাকা
স্নিগ্ধা১৪০ টাকা
ফার্স্ট সিট২১০ টাকা
ফার্স্ট বার্থ১৭৫ টাকা
এসি সিট২১০ টাকা
এসি বার্থ৩১৫ টাকা
ঢাকা টু টাঙ্গাইল টিকেট মূল্য তালিকা

কি কি খাবার পাওয়া যায়

টিকেট কেটে মহেরা জমিদার বাড়ি প্রবেশ পথের হাতের ডান পাশেই খাবার ক্যান্টিন দেখতে পাবেন। এখানে দুইটি ক্যান্টিন আছে। এখানে বিভিন্ন ধরণের হালকা নাস্তা ও ভারী খাবার পাওয়া যায়। আর খাবারের মূল্য বেশ সাশ্রয়ী। এখানে ডাল, ভাত, মুরগি, মাছের প্যাকেজ পাওয়া যায়। পিকনিকে গেলে আগে থেকে আপনার পছন্দ মতো খাবার অর্ডার দিতে পারেন। আপনারা চাইলে বাহির থেকে খাবার নিয়ে যেতে পারেন। ওনাদের অনুমতি নিয়ে ভিতরে বসে খেতে পারেন। তবে পরিষ্কার পরিছন্নতার ব্যাপারে খেয়াল রাখবেন।

হোটেল ও থাকার যায়গা

মহেরা জমিদার বাড়ির মধ্যে থাকার যায়গা নেই। তবে টাঙ্গাইল সদর ও মহেরা জমিদার বাড়ির আশেপাশে অনেক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। আপনারা চাইলে সেখানে রাত্রি যাপন করতে পারেন। হোটেল ভাড়া ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা।

মহেরা জমিদার বাড়ি ভ্রমণ টিপস

আপনি যদি ঢাকা থেকে মহেরা জমিদার বাড়ি ট্যুরে যান তবে সকাল ৬.৩০ থেকে ৭ টার মধ্যে বাসে উঠুন। ৯টা থেকে -১০টার দিকে টাঙ্গাইল বাস স্টেশনে পৌঁছে যাবেন। বাস থেকে নেমে সিএনজি বা অটোরিকশা নিয়ে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে চলে যান। টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকে পড়ুন। আপনি চাইলে বাস থেকে নেমে সকালের নাস্তা সেরে নিতে পারেন অথবা জমিদার বাড়ি গিয়ে ক্যান্টিন থেকে নাস্তা করে নিতে পারেন।

দুপুর পর্যন্ত ঘোরাফেরা করুন ছবি তুলুন। একসাথে অনেকজন গেলে খোলা যায়গায় বসে আড্ডা দিন বা গল্প করুন, ছবি তুলুন। নামাজ পড়তে চাইলে মসজিদে নামাজ পড়ে নিন। দুপুরের খাবার খেয়ে নাগরদোলা কিংবা দোলনায় চড়ুন। সবশেষে বিকাল ৫-৬ টায় বেড় হয়ে যান। আবার সিএনজিতে বা অটোরিকশায় বাস স্টেশনে চলে আসুন। চা-নাস্তা করে বাসে উঠে পড়ুন।

ঢাকার বাহির থেকে বেড়াতে গেলে আপনার এলাকার বাস কয়টায় পৌছায় বা কতো ঘণ্টা সময় লাগে সে অনুসারে আপনার ট্যুর প্লান করুন।

বন্ধের দিন

করোনা কালীন সময়ে লকডাউনের কারনে বাংলাদেশের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের মতো টাঙ্গাইলের মহেরা জমিদার বাড়িও বন্ধ ছিল তবে। এছাড়া বিশেষ কোন কারনে বন্ধ না থাকলে সবসময়ই খোলা থাকে।

জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর

ঢাকা থেকে মহেরা জমিদার বাড়ির দূরত্ব কত?

ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল মহেরা জমিদার বাড়ির দূরত্ব ৮০.৮ কিলোমিটার। টাঙ্গাইল সদর থেকে ১৮ কিমি. ভিতরে।

গাবতলি থেকে মহেরা জমিদার বাড়ি যেতে কত সময় লাগে?

ঢাকার গাবতলি বা মহাখালী থেকে মহেরা জমিদার বাড়ি যেতে প্রায় ২.৫ ঘণ্টা থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে।

কে মহেরা জমিদার বাড়ি স্থাপন করেন?

১৮৯০ সালের কালীচরণ সাহা মহেরা জমিদার বাড়ি স্থাপন করেন। কালীচরন সাহা ও তার ভাই আনন্দ সাহা কলকাতার বাসিন্দা ছিলেন।

সর্বশেষ

প্রিয় পাঠক, আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আমাদের লেখাটি আপনাদের কাছে কেমন লেগেছে জানাতে পারেন। আমাদের লেখা নিয়ে কোন মতামত কিংবা পরামর্শ থাকলে লিখতে পারেন আমাদের কাছে। আপনার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাইলে আপনার লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন কিংবা ফেসবুকে মেসেজ দিন।

আরও পড়ুনঃ লালবাগ কেল্লা ভ্রমণ গাইড। কক্সবাজার ভ্রমণ গাইড, হোটেল ভাড়া।