https://tipswali.com/wp-content/uploads/2021/11/get-rid-of-depression.jpg

হতাশা বিশ্বব্যাপী একটি কমন অসুখ। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মতে, বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৩.৪% মানুষ মানসিক অবসাদ বা হতাশায় ভোগে যেখানে ৫.০% প্রাপ্ত বয়স্ক এবং ৫.৭% যাদের বয়স ষাট বছরের বেশি। সে হিসেবে বিশ্বের প্রায় ২৮০ মিলিয়ন মানুষ হতাশা বা মানসিক অবসাদে ভোগে।

তবে আরও খারাপ সংবাদ হচ্ছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলির ৭৫% এরও বেশি মানুষ মানসিক ব্যাধিগুলোর জন্য কার্যকর কোন চিকিৎসা সেবা পায় না। মানসিক ব্যাধির চিকিৎসা না পাওয়ার অন্যতম কারন হচ্ছে- সম্পদের অভাব, প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর অভাব, সমাজের মানুষের মধ্যে প্রচলিত ভুল ধারণা ও সামাজিক কলঙ্ক।

হতাশা কাকে বলে?

কোন ইচ্ছা পূরণ না হলে বা কোন কাজের দ্বারা আশানুরূপ ফল না পেলে মানুষের মনে যে মানসিক অবসাদ তৈরি হয় তাকে হতাশা বলে।

ডিপ্রেশন বা হতাশা স্বাভাবিক মেজাজের ওঠানামা এবং দৈনন্দিন জীবনে স্বল্পস্থায়ী মানসিক প্রতিক্রিয়া। তবে যখন বার বার পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং তিব্র আকার ধারন করে তখন খুবই ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি হতাশার পরিনতি আত্মহত্যা পর্যন্ত গড়াতে পারে।

আপনি নিজে বা আপনার পরিচিত কেউ যদি মানসিক বিষণ্ণতায় কিংবা হতাশায় ভোগে তাহলে আজকের লেখাটি আপনার জন্য। আজকের লেখায় আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করতে যাচ্ছি- হতাশা বা মানসিক অবসাদ থেকে থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়, মানসিক স্বাস্থ্যের উন্ননতি সুস্থ থাকার কিছু টিপস। এই টিপসগুলো অনুসরন করলে আপনি ইনশাআল্লাহ সকল হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।

হতাশা বা মানসিক অশান্তির কারন গুলো জানুন

আমি আমার ছোট জীবনে যতটুকু বুজলাম ডিপ্রেশন বা হতাশার সবচেয়ে বড় ও অন্যতম প্রধান কারন হচ্ছে দুনিয়ার প্রতি লোভ, অর্থ, সম্পত্তি, ক্ষমতা, রঙিন জীবন যাপনের লোভ, অন্যের আছে আমার নেই এমন চিন্তা, কাউকে ছাড়া নিজেকে অসহয় মনে করা ইত্যাদি। হতাশা থেকে মুক্তি চাইলে প্রথমেই এগুলো বাদ দিন। যা নেই তা নেই কেন তা নিয়ে আক্ষেপ বা মন খারাপ না করে কিভাবে করা যায় ভাবুন। কাউকে ছাড়া বাঁচবেন না এমনটা ভাবা বন্ধ করুন। একবারও কি ভেবেছেন আপনার দাদা, নানা, কিংবা পরিচিত যে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে সে একাই গেছে কিছুই বা কাউকে নিয়ে যেতে পারে নি। সাথে কেবল তাদের ভালো কাজগুলো গেছে।

হ্যা, তবে আমাদের নিজেরদের দৈনন্দিন নানা কাজের প্রভাবও আমাদের মনের উপর পড়ে যার কারনে হতাশা সহজেই বাসা বাধে। নিজের প্রতি নিজের যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে ডিপ্রেশন বা হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

১) রাতে দ্রুত ঘুমাতে যান

রাত জাগা বর্তামান জেনারেশনকে একটি ভয়ানক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত রাত জাগার ফলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে রাত জাগা অবসাদ, উদ্বিগ্নতা ও বাইপোলার ডিজঅর্ডারে ভোগার সম্ভাবনা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এমনকি এটি আত্মহত্যার প্রবনাতাও তৈরি করার জন্য দায়ী। তাই মানসিক অবসাদ বা হতাশা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে নিয়মিত সকাল সকাল ঘুমানোর অভ্যাস করুন।

২) সকালের বাতাস ও সূর্যের আলো গায়ে লাগান

সারা রাত সজাগ থেকে দিনে নাক টেনে ঘুমানোর অভ্যাস যাদের তাদের আশেপাশে নানামুখী বিপদ ঘুরে বেড়ায়। রাতে পর্যাপ্ত ঘুমিয়ে সকাল সকাল সজাগ হোন। ধর্মীয় কাজগুলো সম্পন্ন করুন। এবং সকালের প্রথম ভাগের সূর্যের আলো শুধু আপনার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডিএর মাত্রা বাড়ায় না বং আপনার কার্টিসল মাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। অনেক সময় সকালে বেশি সময় ঘুমিয়ে থাকা ব্যাক্তিরা দিনের মুল্যবান কাজ সম্পন্ন করতে পারেনা। অফিসে বা কাজে যেতে দেরি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ মিটিং মিস করার মতো ঘটনা ঘটে। আর এর প্রভাবও পড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর।

৩) শখের জিনিস তৈরি করুন

অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। আপনি যদি একটু ভালো থাকেন তা আপনাকে থাকতে দিবে না। অলস বসে থাকলে বাজে চিন্তা মাথায় ভর করে।

ড. কিয়েন ভু এর মতে নিজের পছন্দের কোন কিছু করাই হচ্ছে সেরা স্ব-যত্ন টিপস। অর্থাৎ নিজের যত্ন নেওয়ার সব চেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে নিজের পছন্দের কিছু করা। অনেকে ছবি আঁকতে, নকশী কাথা সেলাই করতে, পশু-পাখি পালন, গল্পপের বই পড়তে, বাগান করতে পছন্দ করেন। বুলেট জার্নাল লেখার অভ্যাস করতে পারেন। যদিও বুলেট জার্নালের সাথে আমরা তেমন পরিচিত না। বাংলায় বলতে গেলে কোন ডায়রি লেখা পাশাপাশি লেখাগুলো ছবিতে ফুটিয়ে তোলা। এটা মানসিক অবসাদ দূর করতে বেশ কার্যকরী।

৪) সকালে কোরআন ও গল্পের বই পড়ার অভ্যাস করুন

বর্তমান সময়ে আমরা ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল বা ল্যাপটপ নিয়ে ফেসবুক বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাস্ত হয়ে যাই। এটি খুবই বাজে একটি অভ্যাস। স্কিনের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলে চোখের ক্ষতি ও মাথার ব্রেইনে বাড়তি চাপ পড়ে। গুম থেকে ওঠার পর আমাদের ব্রেইন একদম রিফ্রেস থাকে। ফ্রেস হয়ে ১-২ গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করে একটি মজার গল্পের বই পড়ুন। এটি আপনার মেজাজ ফুরফুরা ও সতেজ রাখবে। নিয়মিত সকালবেলা পবিত্র কুরআন তিলওয়াত করার মাধ্যেম আপনার দিন শুরু করতে পারেন। এর মতো মানসিক প্রশান্তি দ্বিতীয় আর কোথাও খুঁজে পাবেন না। সব চেয়ে ভালো হয় অর্থ বুজে বুজে পড়া। মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে নিয়মিত কোরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। বাংলা অর্থ সহ তিলওয়াত শুনুন।

৫) ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেতে কৃতজ্ঞ থাকুন

আমাদের হতাশার সবচেয়ে বড় কারন হচ্ছে অন্যের সাথে নিজেকে ছোট করে তুলনা করা। হতাশা থেকে মুক্তি পেতে অন্যের যা নেই কিন্তু আপনার আছে সেগুলোর দিকে নজর দিন। আমাদের দিন যতোই খারাপ যাক না কেন- অনেকের হাত নেই আমাদের দুইটি হাত আছে, অনেকে দেখতে পায় না আপনি আমি দেখতে পাই, যাদের পা নেই হাটতে পারে না আমাদের হাটার জন্য পা আছে, থাকার মতো ঘর আছে অনেকের ঘর নেই। প্রতিদিন ৩-৫ টি জিনিসের নাম লিখুন যা আপনার আছে অন্যের নেই। এই অভ্যাস আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করবে।

৬) আত্মীয় ও পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় দিন

আমাদের জীবন ব্যাস্ততা দিয়েই পাড় করে দেই। মজা করা কিংবা আমাদের প্রিয়জনদের কথা একদম ভুলেই যাই। যা একসময় প্রিয়জনদের থেকে আমাদের দূরত্ব বাড়িয়ে তোলে। নিজের কষ্ট ও খারাপ লাগার কথা শেয়ার করার মতো মানুষ থাকে না। আর তখনই হতাশা আমাদের গ্রাস করে ফেলে। ভালো বন্ধু তৈরি করুন। ফেসবুকে কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে বুদ না থেকে সামনা সামনি দেখা করা কথা বলার অভ্যাস করুন। বাসায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থাকলে তাদের সাথে সময় দিন গল্প করুন। বাচ্চাদের সাথে খেলাধুলা করুন। দেখবেন হতাশা উধাও হয়ে গেছে।

৭) নুন্যতম ৩০ মিনিট হাঁটুন

প্রতিদিন ব্যায়াম শারীরিক ও মানসিক উভয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। জিমে সেশনের মধ্যে কিংবা জিমে গিয়ে ব্যায়াম না করলেও প্রতিদিন নুন্যতম ৩০ মিনিট হাটার অভ্যাস করুন। একবারে ৩০ মিনিট হাটা সম্ভব না হলে ১০ মিনিট করে ৩ বার হাঁটুন। নিয়মিত হাটা আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করবে ও ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি দিবে।

8) বাহিরে খেলাধুলা করুন

আমাদের সমাজে যুককরা সবচেয়ে বেশি হতাশয় ভোগেন। সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা অনলাইন গেমসে ডুবে থেকে ভার্চুয়াল দুনিয়ার মতো জীবন যাপনের স্বপ্নে বিভোর থাকে। আর এক সময় আমরা ভুলে যাই যে ভার্চুয়াল আর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর এ থেকে আমাদের মধ্যে হতাশা বাসা বাঁধতে থাকে। প্রতিদিন সম্ভব না হলে সপ্তাহে কিংবা মাসে দুই এক দিন খেলাধুলা করার চেষ্টা করুন। অবশ্যই মোবাইল বা ভিডিও গেমস না।

৯) স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে কাজ করুন

মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি ও শান্তি লাভের অন্যতম সেরা উপায় হচ্ছে অন্যের উপকার করা। দিনে অন্ত একটি ভালো কাজ করার চেষ্টা করুন। আমাদের আশেপাশে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে যারা পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করে, বৃদ্ধাশ্রম, স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচী এইধরনের কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করুন।

১০) নিয়মিত নামাজ আদায় করুন

হতাশা থেকে মুক্তির সহজ ও সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হচ্ছে আল্লাহর নিকট দোয়া প্রার্থনা করা। মন বেশি খারাপ লাগলে মসজিদে চলে যান। বেশি বেশি কোরআন তিলওয়াত করুন, নবীজিদের জীবনী পড়ুন। পরকালের কথা ভাবুন, হতাশা বা ডিপ্রেশন নামক শব্দই ভুলে যাবেন।

সম্মানিত ভিজিটর, জীবনে চলার পথে নানা বাধা বিপত্তি দেখা দিবে এটিকে একটি স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে নিতে হবে। কারন জীবনে বাধা-বিপত্তি না থাকলে এর নাম জীবন না হয়ে স্বপ্ন হতো। জীবন সুন্দর। সুন্দর নজরে দেখুন। নিজেকে সময় দিন। লোভ-লালসা পরিহার করুন, সব কিছু পানির মতো সহজ হয়ে যাবে। আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। পরকালের কথা ও আল্লাহকে স্মরণ করুন।