https://tipswali.com/wp-content/uploads/2021/12/Yoga-tips.jpg

ইয়োগা (Yoga) একটি ইংরেজি শব্দ যার বাংলা অর্থ যোগাসন বা যোগ ব্যায়ম। যোগাসনের মানে হচ্ছে শরীরের সমস্ত অংশকে প্রকৃতির সাথে আত্মস্থ করা। অন্যভাবে বলা যায় ইয়োগা অর্থ শরীর ও মনের যোগ। প্রাচীন ভারতবর্ষে অনেক আগে থেকেই এর প্রচলন ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে যোগাসন আরও বেশি জনপ্রিয়তা ও বিস্তৃতি লাভ করছে। আধুনিক এই সময়ে নিজেকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ রাখতে ইয়োগা বা যোগাসনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় ।

সম্মানিত ভিজিটর, আজকের লেখাজুড়ে আমি আপনাদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করবো- ইয়োগা করার নিয়ম, ইয়োগা বা যোগাসনের তালিকা, উপকারিতা, সাবধানতা ও যোগ ব্যায়াম সম্পর্কিত নানা বিষয় বিস্তারতি।

Table of Contents

ইয়োগার প্রকারভেদ

সাধারণত ১৪ প্রকারের ইয়োগা বা যোগাসন করা হয়ে থাকে। তবে বিশ্বব্যাপী ৭ ধরনের ইয়োগা বা যোগাসন অনেক বেশি জনপ্রিয়। চলুন পর্যায়ে ৭ প্রকার যোগ ব্যায়াম বা ইয়োগা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক-

১) হস্ত যোগাসন

আপনি যদি আপনার শরীরে স্বস্তি দিতে চান ও আপনার মস্তিস্ককে আরাম দিতে চান তাহলে আপনার জন্য এই ইয়োগা। হস্ত যোগাসন করার নিয়ম হচ্ছে পিঠ টানটান করে সোজা হয়ে বসে হাত উপরের দিক করে জড়ো করা।

২) অষ্টাঙ্গনা যোগ

অষ্টাঙ্গনা যোগাসনে মূলত শারীরিক পরিচর্যা ও ব্যায়ামের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অষ্টাঙ্গনা যোগাসন করার নিয়ম হচ্ছে- দুই হাত, পা, নাসিকা, কপাল এই আট অঙ্গ স্পর্শ করে মাটিতে অবস্থান।

৩) বিক্রম যোগ

১৯৪৬ ভারতীয় নাগরিক বিক্রম চৌধুরী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি যোগাসন। মূলত একটি উত্তপ ঘরের মধ্যে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি এবং গভীর নিঃশ্বাস নেওয়া হয়। বিভিন্ন ধরণের ইয়োগার মধ্যে এটি বেশ জনপ্রিয়।

৪) পদ্মাসন যোগ

বিভিন্ন ধরনের ইয়োগার মধ্যে পদ্মাসন বেশ পরিচিত সহজ একটি যোগ ব্যায়াম। বাঁ রানের উপর ডান পা এবং ডান রানের উপর বাঁ পা রেখে, মেরুদণ্ড সোজা হয়ে বসে দুই হাত সোজা করে হাঁটুর উপর রেখে গভীর শ্বাস নেওয়া হয়।

৫) কুন্ডলিনী যোগ

হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা তন্ত্র ও ধ্যানের মাধ্যমে এই ধরনের যোগাসন করা হয়।

৬) রেস্টোরেটিভ যোগাসন

এই যোগ ব্যায়ামটি আমেরিকার বিখ্যাত যোগব্যায়ম প্রশিক্ষক জুডিথ হ্যানসন দ্বারা উদ্ভাবিত একটি যোগব্যায়াম। এই পদ্ধতিতে এক একটি ভঙ্গি ২০ মিনিট সময় ধরে ধরে রাখা হয়। যদিও বেশ সময় সাপেক্ষ একটি ইয়োগা ব্যায়াম তবে মানসিক চাপ ও শারীরিক চাপ থেকে মুক্তি দিতে বেশ কার্যকরী।

৭) ইন ইয়োগা

আমেরিকার বিখ্যাত মার্শাল আর্ট বিশেষজ্ঞ পাউলি জিঙ্ক ১৯৭০ সালে ইয়িন যোগ ব্যায়ামের উদ্ভব। এই পদ্ধিতিতে এক একটি ভঙ্গি ১০ মিনটি বা তার বেশি সময় ধরে রাখার মাধ্যমে প্যারামসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করা এবং মানসিক ও শারীরিক চাপ এবং উত্তেজনা মুক্ত করা।

যোগাসন বা ইয়োগা করার নিয়ম

ইয়োগা বা যোগাসন করার জন্য আপনার অনুকূল পরিবেশ, সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চলুন এ পর্যায়ে ইইয়োগা বা যোগ ব্যায়মের নিয়মগুলো জেনে নেওয়া যাক-

১) ঢিলেঢালা পোশাক পড়ুন

যোগাসনের সময় আরামদায়ক ও ঢিলেঢালা পোশাক পড়া উত্তম। কারণ যোগাসনের জন্য আপনাকে বিভিন্ন ভঙ্গি করার প্রয়োজন হবে। আর টাইট-ফিট পোশাক পড়লে এটি আপনার জন্য বাধার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। পাশাপাশি টাইট-ফিট পোশাক পরিধান করা শরীরের জন্যও ভালো না।

২) গহনা পরিধান না করা

আমরা যারা নতুন অবস্থায় যোগ ব্যায়ম শুরু করি অনেকেরই এই বিষয়টি জানা থাকে না। যোগ ব্যায়ামের সময় শরীরে কোন অলংকার যেমন- গয়না, হাত ঘড়ি, চুরি, চশমা ইত্যাদি পড়া থেকে বিরত থাকুন।

৩) সঠিক পরিবেশ

কোলাহল কিংবা মানুষের উপস্থিতি আপনার মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে। পাশাপাশি পরিষ্কার পরিছন্নতাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই যোগাসন বা ইয়োগার জন্য নিরিবিলি, শান্তিপূর্ণ ও পরিষ্কার পরিছন্ন স্থান বেঁছে নিন।

৪) পর্যাপ্ত সময় ও মানসিক স্থিতি

দুই তিনটি দৌড় লাফ দিলে এই ব্যায়াম হয় না। এ জন্য সময়ের প্রয়োজন, প্রয়োজনে মানসিক স্থিতি। সকালের বাতাস অনেক বেশি বিশুদ্ধ ও নির্মল থাকে তাই ইয়োগা করা আদর্শ সময় হচ্ছে ফজরের নামাজ আদায় করার পর ভোর ৫ টা থেকে সকাল ৭ টা পর্যন্ত। তবে সকাল সন্ধ্যা, গোসলের আগে বা রাতেও করা যায়। প্রতিদিন জোর করে ইয়োগা করতে বসার দরকার নাই। মন ফ্রেশ থাকলে যোগাসনে বসুন। যোগ ব্যায়াম শুরু করার আগে মনের মধ্যে থাকা সকল চিন্তা ও নেতিবাচক ভাবনাগুলো দূর রাখুন। এমনকি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকলেও যোগাসনে বসার দরকার নেই।

৫) ইয়োগা ম্যাট

যোগ মাদুর বা ইয়োগা ম্যাট মূলত যোগাসনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। বিশেষ এই ম্যাট যোগ ব্যায়াম করার সময় হাত-পা ও শরীর পিছলে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। খেলাধুলার সরঞ্জাম বিক্রি করে এমন সব দোকানে ইয়োগা ম্যাট কিনতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে একটি ইয়োগা ম্যাটের দাম ৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা।

৬) খালি পেটে শুরু করুন

সব সময় মনে রাখবেন ইয়োগার সময় পেট খালি থাকতে হবে। সাধারণত আমরা রাতে খেয়ে ঘুমিয়ে যাই আর এ কারনে সকালে আমাদের পেট এমনিতেই খালি থাকে। যাহোক ইয়োগা করার অনন্ত ২ থেকে ৪ ঘণ্টা আগে কোন কিছু খাওয়া যাবে না। আবার শরীরে অস্বস্তি থেকে মুক্ত থাকতে ইয়োগা করার ২ ঘণ্টা পড় ভারী খাবার গ্রহণ করুন। সুষম খাবারের তালিকা

৭) শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহনে মনযোগী হওয়া

প্রাণায়াম হচ্ছে মূলত ইয়োগার সময় শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ। এতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের সঠিক স্থানে অক্সিজেন পৌঁছানো হয়। আপনার শরীর ও মনেক একত্র করতে এর জুড়ি নেই বললেই চলে।

৮) কোর্স করুন

ইয়োগা খুবই উপকারী আবার সংবেদনশীল। ভুল অনুশীলন আপনার উপকারের বদলে জীবননাশের কারন হয়ে দাড়াতে পারে। বর্তমানে অনলাইনে নানা ইয়োগা কোর্স কিনতে পাওয়া যায় আবার অনেক ইয়োগা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে যেখানে আপনি সঠিক নিয়মে ইয়োগা বা যোগাসন শিখতে পারেন।

প্রিয় ভিজিটর, আশা করছি ইয়োগা বা যোগাসন করার নিয়ম সম্পর্কে আপনি ধারণা লাভ করেছেন।

যোগাসন বা ইয়োগা করার উপকারিতা

ইয়োগা বা যোগ ব্যায়মের নানা উপকারিতার কথা লোক মুখে শুনতে পাওয়া যায়। আসলে এর বাস্তব ভিত্তিও সত্য। চলুন এপর্যায়ে যোগ ব্যায়াম বা ইয়োগার উপকারিতা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক-

১) মানসিক চাপ ও হতাশা থেকে মুক্তি

ইয়োগার উপকারিতার কথা বলতে গেলে সবার আগে যে বিষয়টি চলে আসে সেটি হচ্ছে মানসিক চাপ থেকে মুক্তি। অনেকগুলো গবেষণায় দেখা যায় যে, এটি কর্টিসলের নিঃসরণ কমাতে পারে। কর্টিসল মূলত একধরনের প্রাথমিক স্ট্রেস হরমোন।

২) দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি

বিশেষজ্ঞদের মতে উদ্বেগের অনুভূতি অর্থাৎ দুশ্চিন্তা মোকাবেলায় যোগ ব্যায়াম বেশ কার্যকরী। অনেক গবেষণায় এটি সত্য বলে প্রমানিত হয়েছে।

৩) শারীরিক প্রদাহ থেকে মুক্তি

মানসিক সুস্থতার জন্য শারীরিক সুস্থতাও বেশ জরুরী। যোগ ব্যায়াম বা যোগাসন শারীরিক প্রদাহ কমাতে পারে। ২০১৫ সালে একটি গবেষণা চালানো হয় যেখানে ২১৮ জন অংশগ্রহণকারীকে ২ টি আলাদা দলে ভাগ করা হয়। একটি দল ইয়োগা করে আরেকটি দল করে না। এর পড় উভয় দল মাঝারি ও কঠিন ব্যায়ামে অংশগ্রহণ করে। ফলাফল হিসেবে দেখা যায় যে দল ইয়োগায় অংশগ্রহণ করে তাদের মানসিক চাপের মাত্রা ও শারীরিক প্রদাহ কম ছিল। (জার্নাল অভ ক্লিনিক্যাল এন্ডা ডায়াগনস্টিক রিসার্চ ফর ডক্টরস)

৪) হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি

ইয়োগার অন্যতম একটি উপকারিতা হচ্ছে এটি হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি করে। ২০০৪ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত ১১৩ জন ব্যাক্তির উপর একটি গবেষণা চালানো হয়। যাদের এক বছর যোগব্যায়ামের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় পাশাপাশি খাবার তালিকায়ও পরিবর্তন আনা হয়। এই সকল অংশগ্রহণ কারীর ২৩ শতাংশ কোলেস্টেরল হ্রাস, ২৪ শতাংশ এলডিএল কোলেস্টেরল হ্রাস পায়। ইয়োগা ভিত্তিক ব্যায়ামগুলি করোনারি ক্ষতগুলির রিগ্রেশন এবং মায়োকার্ডিয়াল পারফিউসনের উন্নতিতে সাহায্য করে।

৫) জীবনের মান উন্নয়ন

জীবনযাত্রার মান এর সাথে একাধিক বিষয় জড়িত। যদি একটি বা দুইটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে জীবনযাত্রার মান নির্ধারণ করা উচিত না। তবে গবেষণায় ইয়োগা বা যোগাসনের উপকারিতা হিসেবে বলা হয়েছে- এটি ঘুমের গুনমান উন্নয়ন, সামাজিক কার্যকারিতা উন্নতি, আধ্যাতিক সুস্থতা বাড়ানো এও বিশেষ করে ক্যান্সার রোগীর উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার লক্ষন কমাতে সাহায্য করতে পারে। (সুত্র-কলেজ অভ ফ্যামিলি ফিজিসিয়ান অভ কানাডা)

৬) দীর্ঘস্থায়ী ব্যাথা থেকে মুক্তি

অনেকে দাবি করেন ইয়োগা দীর্ঘস্থায়ী ব্যাথা থেকে মুক্তি দিতে পারে। তবে এনিয়ে আরও বেশি গবেষণা প্রয়োজন।

৭) পর্যাপ্ত ঘুম

ঘুমের সাথে রক্তচাপ, মন ও ব্রেইনের একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। বেশি দুশ্চিন্তা থাকলে, শারীরিক প্রদাহ, মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে নিয়মিত ঘুম হয় না। ইয়োগা করারফলে এই সকল সমস্যা থেকে মুক্তি মেলে যা ঘুমের উপর বেশ প্রভাব ফেলে।

৮) শ্বাস-প্রশ্বাসের উন্নতি

যাদের হাঁপানি কিংবা শ্বাস প্রশ্বাস জনিত সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য সঠিক নিয়মে ইয়োগার উপকারিতা যেমনি তেমন ভুলভাল ইয়োগা ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। যাদের এই ধরনের সমস্যা রয়েছে তাদের অবশ্যই ইয়োগা প্রশিক্ষকের শরণাপন্ন হয়ে ইয়োগা শিখে অনুশীলন করা উচিত।

৯) ইয়োগার অন্যান্য উপকারিতা

উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলোর পাশাপাশি ইয়োগা বা যোগাসন মাইগ্রেনের উপশম, স্বাস্থ্যকর খাওয়ার অভ্যাস গঠন, শরীরকে শক্তিশালী, শরীরে সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণ, রক্ত সঞ্চালনের সঠিক মাত্রা বজায় রাখা, ব্লাড প্রেসার কমানো, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করার মতো নানা উপকারিতা রয়েছে।

ইয়োগা করার সেরা সময় কখন ?

বিশেষজ্ঞদের মতে ভোরের সূর্য ওঠার সাথে সাথে যোগ ব্য্যাম শুরু করা উত্তম। তবে হাতে পর্যাপ্ত সময় ও সথিক পরিবেশ থাকলে যেকোন সময় করা যেতে পারে।

সাবধানতা

আপনার যদি কোন শারীরিক সমস্যা থেকে থাকে তবে যোগব্যায়াম শুরু করার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। সঠিক নিয়মে ইয়োগা না করলে উপকারের বিপরীতে ক্ষতি হতে পারে। আপনার শরীর, বয়স অনুসারে আপনার জন্য আলাদা আলাদা বা বিশেষ ধরনের ইয়োগা প্রয়োজন হতে পারে। আর একজন ইয়োগা বা যোগাসন বিশেষজ্ঞই কেবল সঠিকভাবে বলতে পারবে।

https://tipswali.com/wp-content/uploads/2021/12/Yoga.jpg
ইয়োগা ছবি

সর্বশেষ

সম্মানিত ভিজিটর, আমরা আশা করছি যোগব্যায়াম বা ইয়োগা করার নিয়ম, উপকারিতা, ইয়োগার প্রকারভেদ সম্পর্কে আপনি বিস্তারিত ধারণা পেয়ে গেছেন। আমাদের লেখা নিয়ে আপনার কোন প্রশ্ন কিংবা পরামর্শ থাকলে শেয়ার করতে পারেন আমাদের সাথে।